বিশ্বাসের মূল্য রক্তবিষাদির আতুর ঘরে । লেখক বাবুল বিশ্বাস। পর্ব ১
রুমে শুয়ে অশালীন অবস্থায় পর-পুরুষের সাথে ভিডিও কলে রঙ তামাশায় মগ্ন চন্দনা। দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে চন্দনার চার বছরের বাচ্চা মেয়ে "আরুশি" কাঁদছে। সেদিকে কোনো খেয়াল নেই তার, সে তো পর-পুরুষের সাথে নষ্টামিতে ব্যস্ত। নাতনী কোলে নিয়ে হঠাৎ রুমে প্রবেশ করলো চন্দনার শাশুড়ি "জোৎস্না দেবী"। একমাত্র ছেলে "সন্দীপ"-এর বউয়ের এমন অবৈধ সম্পর্ক চোখে দেখে মুহূর্তেই মাথাটা ঘুরছে তার। উনি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছেন ফোনের ওপাশে একটি মাঝ বয়সী পুরুষের প্রতিচ্ছবি।
রুমে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে আশেপাশে তাকিয়ে নিজের শাশুড়ি ও মেয়েকে দেখে হকচকিয়ে যায় চন্দনা। ভুলক্রমে ভিতর থেকে দরজা লক করতে ভুলে গিয়েছে আজ। হুশ ফিরতেই সাথে সাথে ফোনটা কেটে ওড়না দিয়ে শরীর ঢেকে নিলো চন্দনা। অতঃপর শাশুড়ির দিকে রক্তিম চোখে তাকিয়ে, ক্রোধিত কণ্ঠে বললো,
"অভদ্র মহিলা! মিনিমাম কমনসেন্স নেই মাথায়? কারো রুমে আসলে নক করে আসতে হয় এইটুকু জানেন না? অসহ্য মহিলা কোথাকার। যত জ্বালা সব আমার। স্বামীকে খেয়ে বুড়ো বয়সে ভীমরতিতে ধরেছে। লুকিয়ে লুকিয়ে এসে মজা নিচ্ছেন?" আরো অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে লাগলো চন্দনা।
ঘৃণিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, দাঁতে দাঁত চেপে জোৎস্না দেবী বললো,
"মুখ সামলে কথা বলো বউ মা। নক করে আসলে তো তোমার এমন নোংরা চরিত্র কখনো দেখতেই পেতাম না। বাচ্চার মা হয়েও পরপুরুষের সাথে নোংরামি করতে লজ্জা করে না? সময় আছে এখনো ভালো হয়ে যাও। বাবা হারা একমাত্র ছেলেটা আমার পেটের দায়ে তিন বছর যাবৎ বিদেশে খাঁটতে খাঁটতে মরছে আর বউ এদিকে পরকীয়া নামক জঘন্য কাজে মগ্ন। ছিঃ! ছিঃ! এদিন দেখার আগে মরণ হলো না কেন আমার!"
এতো বড় অন্যায় করেও সামান্য পরিমাণ ভয় কিংবা অনুশোচনা দেখা গেলো না চন্দনার মধ্যে। সে মুখ বাঁকিয়ে বললো,
"মরলেই বাঁচি! এতো মানুষ মরছে তাও তো আপনার মরণ নেই।"
লজ্জায় ঘৃণায় এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না আর, তাড়াহুড়ো করে নাতনীকে পুনরায় কোলে করে আঁচলে মুখ চেপে বেরিয়ে পড়লেন জোৎস্না দেবী। নিজের রুমে এসে ধপ করে খাটের উপর বসে পড়লেন তিনি। চোখের সামনে বারংবার ভাসছে পুরনো কিছু স্মৃতি। স্বামী মারা গিয়েছে অল্প বয়সে তার। একমাত্র ছেলে সন্দীপ**কে আঁকড়ে ধরে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি। বহু কষ্ট করে ছেলেকে পড়াশুনা করিয়ে মানুষ করেছেন। এমন দিন গিয়েছে ঘরে অল্প ভাত ছিল, নিজে না খেয়ে ছেলেকে দিয়ে দিতেন। এতো কষ্ট করেও আদৌ ছেলেটা মানুষ করতে পারলেন না তিনি।
কলেজে উঠেই চন্দনার সাথে সম্পর্ক হয় সন্দীপরে। ভালোবেসে বিয়ে করেছে দু'জন। জোৎস্না দেবী প্রথমে অমত করলেও একমাত্র ছেলেকে হারানোর ভয়ে মেনে নিয়েছেন। সেই থেকেই সন্দীপ সংসারের হাল ধরে একটা কাপড়ের দোকানে যুক্ত হয়েছিল। বিয়ের কয়েকমাস যেতেই জোৎস্না দেবীকে সহ্য করতে পারে না চন্দনা। স্বামীর স্বল্প ইনকামে নিজেরই হচ্ছে না, সেখানে শাশুড়িকে বাড়তি ঝামেলা মনে হচ্ছে। কথায় কথায় খাবারের খোঁটা দেয়। পেটের দায়ে তাও এক থাল ভাত, আর এক থাল খোঁটা রোজ খেতে হয় তার!
বাসার সব কাজ জোৎস্না দেবীকেই করতে হয়, তবুও বিভিন্ন কথা বানিয়ে বানিয়ে বলে স্বামীকে রাগিয়ে দেওয়া যেন নিত্যদিনের কাজ চন্দনার। সংসারে ঝামেলা লেগেই থাকতো। লোকজনের কটুকথা ও মানসম্মানের ভয়ে চুপচাপ সবকিছু মুখ বুজে হজম করতেন জোৎস্না দেবী। মাঝে মাঝে সহ্য করতে না পেরে চন্দনার আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে ছেলেকে দু'চারটে কথা বললেও উল্টো মায়ের উপরে রেগে যেত সন্দীপ। ছেলের এমন আচরণে মন ক্ষুণ্ণ হতো তার। নীরবে অশ্রু বিসর্জন দেন সবার অগোচরে। উনি বুঝে নিয়েছেন ছেলেটা আর আগের মতো নেই, বউয়ের বাধ্যগত হয়ে গিয়েছে।
চন্দনা বলতেই যেন পাগল ছেলেটা। ঠিক-বেঠিক না দেখে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে স্ত্রীকে। পুরোপুরি নির্ভরশীল তার উপরে, চন্দনার সিদ্ধান্ত বিনা বাক্যে গ্রহণ করে। বছর খানেক ঘুরতেই সংসারের ঝামেলা বাড়তেই থাকে। সেই সাথে চন্দনার চাহিদা বাড়ে। এমন টানাটানি সংসারে সন্তুষ্ট নয় সে। এই নিয়ে সন্দীপরে সাথে প্রায়ই ঝামেলা করতো। মামা জেঠার জোর না থাকায় অনার্স কমপ্লিট করেও কোনো চাকরি মিলছিল না সন্দীপরে। বহুকষ্টে একটা চাকরি মিললেও মেয়ে হবার একবছর পরেই ভাগ্যক্রমে সেটাও চলে গেল। বাধ্য হয়ে ঋণ নিয়ে বাহিরে চলে গেল। জোৎস্না দেবী বারংবার না করেছেন কিন্তু চন্দনা বিভিন্ন কৌশলে স্বামীকে বিদেশ যেতে বাধ্য করলো। তার যে অনেক টাকার প্রয়োজন। সন্দীপও পরিবারের কথা চিন্তা করে নিজ দেশ ছেড়ে ভিনদেশে পাড়ি জমিয়েছে আজ তিনটে বছর। বহু কষ্ট করে টাকা ইনকাম করে চন্দনার অ্যাকাউন্টে জমা করে। ইচ্ছেমতো সংসারে কিংবা নিজে খরচ করে সে, কখনো কোনো হিসাব নেয় না সন্দীপ। এতো ভালোবাসার পরেও চন্দনার এই অধঃপতন কি করে মেনে নিবে ছেলেটা? ভাবতেই চোখ দু'টো ভিজে গেল জোৎস্না দেবীর। বুক চিরে দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসলো। দাদীকে কাঁদতে দেখে ছোট্ট আরুশিও কেঁদে দিল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। এর একটা বিহিত করতেই হবে। তাকে কল দিয়ে ছেলেকে জানাতেই হবে এই বিষয়।
রাত আটটায় কাজ শেষে বাসায় ফিরলো সন্দীপ। ফ্রেশ হয়ে এসেই ডাটা অন করে চন্দনাকে ইমুতে কল দিল। কয়েকবার কল দিতেই বারংবার বিজি পাচ্ছে। ইদানীং প্রায় সময়ই এমনটা হয়, এসব এতো গভীরে ভাবে না সে। মাঝে মাঝে কখনো জিজ্ঞেস করার আগেই চন্দনা বাড়িতে কিংবা বান্ধবীদের সাথে কথা বলেছে বলে জানায়। বোকা ছেলেটা অন্ধের মতো বিশ্বাস করে বাজে ভাবে ঠকে যাচ্ছে তা আর বুঝল না। চন্দনাকে না পেয়ে, "হয়তো বন্ধুদের সাথে কথা বলছে" ভেবে খাবার খেতে বসল সন্দীপ।
এরিমধ্যে চন্দনা কল দিয়েছে, তাড়াতাড়ি খাবার শেষ করে ফোন রিসিভ করলো। চন্দনার হাসিমুখখানা দেখে যেন সারাদিনের পরিশ্রম ভুলে যায় সন্দীপ। সে আহ্লাদী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
"কেমন আছো জান? আর হ্যাঁ স্যরি সোনা! অনেক দিন পরে রিয়া কল দিয়েছিল ওর সাথে কথা বলছিলাম তাই বিজি পেয়েছ তুমি।"সন্দীপ হেসে বললো,
"আমি বুঝেছি পাখি, স্যরি বলতে হবে না তোমাকে। এবার বলেন আমার পাখিটা কেমন আছে?"
শুয়ে শুয়ে দু'জন আরো মিনিট দশেক কথা বললো। সারাদিন ক্লান্ত শরীর বিছানা পেয়ে চোখ জুড়ে ঘুম নেমে আসলো সন্দীপরে। তাকে বারবার হাই তুলতে দেখে চন্দনা কোমল কণ্ঠে বললো,
"তোমার নিশ্চয়ই ঘুম পেয়েছে সোনা? আচ্ছা ঘুমাও রাত জেগো না। ঘুমিয়ে পড়ো জান। উম্মাহ! গুড নাইট!"
ইশশ তার পাখিটা কিছু বলার আগেই বুঝে যায় সবকিছু। কতোটা ভাবে মেয়েটা তাকে নিয়ে—ভাবতেই ভিতর থেকে ভালো লাগা কাজ করছে সন্দীপরে। স্বস্তিতে চোখ দু'টো বন্ধ করে দিয়ে মৃদু হেসে বললো, "ভালো থেকো পাখি। গুড নাইট!"
চন্দনাই লাইন কেটে দিল। সন্দীপও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল। চন্দনা সাথে সাথে অন্য ইমু নাম্বার থেকে বিদেশকে ভিডিও কল দিল। বিদেশ অভিমানী কণ্ঠে বললো, "এতো সময় লাগে তোমার **চন্দনা** বেবি? আমি যে তোমার অপেক্ষা করতে করতে পাগল হয়ে যাচ্ছি।"
চন্দনা লজ্জা পেয়ে বললো, "যা দুষ্টু, আসবো তো। সন্দীপ আগামী মাসের টাকাটা পাঠালেই আসবো।"
বিদেশ বাঁকা হাসলো। আজ দুই বছর যাবৎ বিদেশের সাথে পরকীয়ায় আসক্ত **চন্দনা**। এই ইমু নাম্বার সন্দীপ জানে না। এতোটাই বিশ্বাস করে বউকে যার ফলে এসব নিয়ে কখনো ভাবেও না সে। কিন্তু বোকা পুরুষটা এটা জানে না কাউকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতে নেই।
সত্য কখনো চাপা থাকে না। অসতর্কতার ফলে আজ জোৎস্না দেবীর চোখে পড়লো। তবুও এসব নিয়ে কোনো ভয় নেই চন্দনার। সন্দীপকে বললেও বিশ্বাস করবে না, তা বেশ জানা আছে তার।
জোৎস্না দেবী সব সময় তার বাটন ফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকেন ছেলের ফোনের অপেক্ষায়। কিন্তু দু'দিন হয়ে গেল ছেলের একটা কল আসলো না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো, তিনি আরুশিকে নুডলস রান্না করে দিচ্ছেন। হঠাৎ মুঠোফোনটা বেজে উঠলো। ওপাশ থেকে ছেলের কণ্ঠে "মা" ডাকটা শুনে কলিজা ঠান্ডা হয়ে গেল তার। দু'মিনিট কথা বলার পরে ইতস্তত করে ডাকলেন,
"সন্দীপ...?"
"হ্যাঁ মা। কিছু বলবে? তাড়াতাড়ি বলো কাজের চাপ আছে।"
"বাবা বাড়িতে ফিরে আয়। কতটা দিন তোকে দেখি না!"
সন্দীপ বিরক্ত হয়ে বললো, "মা তোমার সমস্যাটা কি বলতো? দেশে গিয়ে খাওয়াবো কী তোমাদের? রাখছি কাজ করবো এখন।"
জোৎস্না দেবী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, "কাদের জন্য এতো কষ্ট করিস বাবা? যাকে কষ্ট করে নিজের সবগুলো টাকা দিয়ে দিস সেই মানুষটা তোকে ঠকাচ্ছে বাবা। বউমা বেগানা পুরুষের সাথে ফষ্টিনষ্টি করে। আমি নিজ চোখে দেখেছি বাবা..."
সন্দীপ ক্রোধিত কণ্ঠে বললো, "মা...! ছিঃ! ছেলের সাথে এসব বলতে লজ্জা করে না। আমি জানতাম তুমি চন্দনাকে পছন্দ করো না। আমার চন্দনা কেমন আমি সেটা ভালো করে জানি। আমার বিশ্বাস এতো ঠুনকো নয়।" বলেই কল কেটে দিল সে।
জোৎস্না দেবীর চোখ দিয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। করুণ কণ্ঠে আক্ষেপ করে বললেন, "তোর এই অন্ধ বিশ্বাসের জন্য তুই ঠকে গেলি রে সন্দীপ। আজও মানুষ চিনলি না তুই।"
এর মধ্যে চন্দনা এসে পিছন থেকে বললো, "ছেলেকে কান পড়া দিয়ে ভালো সাজতে আসছেন? মরার বয়স হয়েছে, তবুও বুড়ো বয়সে এসে এখনো কূটনামি করার স্বভাব গেল না!"
মেয়েকে কোলে নিয়ে রান্না ঘর থেকে চলে গেল চন্দনা জোৎস্না দেবী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আজ নিজের খুব অভাববোধ করছেন একটা মেয়ের—যাকে মন খুলে কষ্টের কথাগুলো বলতে পারতেন। নিজেকে সব থেকে অসহায় মনে হচ্ছে তার।

Comments
Post a Comment