বিশ্বাসের মূল্য রক্তবিষাদির আতুর ঘরে। লেখক বাবুল বিশ্বাস। পর্ব ২
দু-দু'টো দিন গত হলো। আজ বিদেশ বাড়ি আসছে, সেই সাথে চন্দনার মনে চলছে তীব্র আন্দোলন। তার হৃদয় জুড়ে আনন্দের শিহরণ বইছে বারংবার। রুমে বসে নিজেকে পরিপাটি করছে, বিভিন্ন সাজসজ্জায়, দামী শাড়ি-চুড়ি পরে রেডি হয়ে নিলো। রুম ডেটে যাচ্ছে সেখানে তো আর সাদামাটা ভাবে যাওয়া যায় না! তাই নিজেকে জড়িয়ে নিলো কৃত্রিম রূপে। বারংবার আয়নায় নিজেকে দেখছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। এরিমধ্যে ছোট্ট আরুশি ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে মাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আধো আধো কণ্ঠে বললো,
"আম্মু তুমি তই দাত্তো (যাচ্ছ)? এতো ছাজুগুজু করতো কেনো? তোমালে মেলা থুন্দর লাগে! আমিও তোমাল থাতে দাবো।"
বাচ্চা মেয়েটার কথায় মন গললো না পাষাণী মায়ের! সে তো অন্য পুরুষে কঠিন ভাবে আসক্ত! সেখানে নিজের স্বামী সন্তান কি করে ভালো লাগবে? এর শেষ পরিণতি কোথায় গিয়ে থামবে নিজেও জানে না। হয়তো সেদিন নিজের করা পাপের জন্য জীবন বিনাশ ঘটবে, আর আফসোস করবে। কেননা সৃষ্টিকর্তার আদেশ অমান্য করলে শাস্তি অনিবার্য! হয়তো সাময়িক সময়ের জন্য ছাড় দেন নিজেকে শুধরে নেবার জন্য, কিন্তু তিনি কাউকে ছেড়ে দেন না। চন্দনা মেয়ের আচরণে বিরক্তবোধ হলো। মেয়েকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে দিয়ে, ধমক দিয়ে বললো,
"শয়তানের বাচ্চা তোকে সব বলতে হবে। সবসময় এতো জ্বালা ভাল্লাগে না আমার। যা তোর দাদির কাছে যা।"
ছোট্ট মেয়েটা মায়ের ধমক খেয়ে কেঁদে দিলো। জোৎস্না দেবী আরুশির কান্নার আওয়াজ শুনে নিজের কাছে ডেকে নিলেন। দূর থেকে চন্দনাকে এই রূপে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললেন তিনি। সন্দিহান দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন। আজ দুদিন ধরে কেউ কারো সাথে কথা বলে না। এতে অবশ্য চন্দনার কিছু যায় আসে না, আরো ভালো হয়েছে তার।
সকাল দশটা বেজে চলছে। চন্দনাকে এক্ষুনি বের হতে হবে। জোৎস্না দেবী নাতনীকে নিয়ে নিজের রুমে শুয়ে আছেন। চন্দনা একটু উঁকি দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
"এ্যাই শুনুন? আমি একটু ব্যাংকে যাচ্ছি। আর বাসায় তো বাজার শেষের দিকে। সবকিছু গুছিয়ে ফিরতে দেরি হবে। তাই আরুশিকে সাথে নিচ্ছি না, ওর খেয়াল রাখিয়েন।"
জোৎস্না দেবীর সন্দেহ তীব্র হলো, নিজেকে আর দমিয়ে রাখতে না পেরে তাচ্ছিল্য করে বললেন,
"বাসায় বাজার যা আছে তাতে তো আরো দশদিন চলে যাবে ভালোভাবে। ব্যাংকে কি এমন কাজ যে সারাদিন লাগবে? না-কি ব্যাংকের নাম করে নতুন নাগরের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছো?"
"বাসায় বসে বসে সব হাতের কাছে পান তো তাই টের পান না। সব ঝামেলা তো আমাকেই সহ্য করতে হয়। আপনার ছেলে তো আর এসে সব কাজ করে দিয়ে যায় না। আবার কথাও শুনান আমাকে। আজকেই সন্দীপ শুধু কল দিক, হয়তো বাসায় আপনি থাকবেন না হয় আমি।" —ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো চন্দনা।
"সে আর নতুন কি? এগুলো তো তোমার পুরনো অভ্যাস। এইটা আর বাসা নেই নরকে পরিণত হয়েছে! এই নরক থেকে আমিও মুক্তি চাই।"
চন্দনা শুনেও শুনলো না। এখন কথা বাড়ানোর সময় নেই তার। দ্রুত চলে গেলো বিদেশের দেওয়া ঠিকানায়। জোৎস্না দেবী চন্দনার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হতাশার শ্বাস ছাড়লেন। সৃষ্টিকর্তার নিকট বারংবার নিজের মৃত্যু কামনা করছেন। এই নরকে এক সেকেন্ডও থাকতে ইচ্ছে করছে না তাঁর।
সারাটা দিন রঙ তামাশায় একান্ত সময় পার করলো চন্দনা ও বিদেশ। বেলা গড়িয়ে গিয়ে সন্ধ্যার আভা ছড়িয়ে পড়ছে প্রকৃতি জুড়ে। দুজন মিলে ফ্রেশ হয়ে বিদায় নিলো।
আরুশি মায়ের জন্য কান্না করছে। মায়ের কাছে যাবে সে। জোৎস্না দেবী নানা ভাবে থামানোর চেষ্টা করছেন। এরিমধ্যে কয়েকবার চন্দনাকে কল দিয়েছিলেন কিন্তু রিসিভ হয়নি। সন্ধ্যার পরে খালি হাতে ফুরফুরে মেজাজে বাসায় আসলো চন্দনা। চন্দনাকে দেখা মাত্রই জোৎস্না দেবী আগবাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
"এতো দেরী হলো কেনো তোমার? তুমি না বাজার আনতে গেলে, তাও ফিরলে তো খালি হাতেই। কোনো সমস্যা হয়নি তো?"
"আর বইলেন না ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে পারিনি আজ। তারমধ্যে আবার বাড়ি থেকে ভাবি কল দিয়েছিলো ডাক্তার দেখানোর জন্য। তাই বাড়ি গিয়েছিলাম।"
"তোমার ভাবি বেশি অসুস্থ নাকি? এখন কেমন আছে?"
"ভালো আছে এখন।"
জোৎস্না দেবী আর কিছু বললেন না। ভাবির কথা বলে এখানে-সেখানে যায় চন্দনা; আদৌ কোথায় যায় তা আর কখনো জানা হলো না তাঁর। তিনি চন্দনার কথাই বিশ্বাস করে নিলেন। পরক্ষণে আরুশি মাকে দেখে জাপ্টে ধরলো মায়ের গলা। মেয়ের উপরে একরাশ বিরক্ত হলো সে, তবুও কোলে করে নিজের রুমে চলে গেলো। বিদেশকে একটা টেক্সট করে জানিয়ে দিলো বাসায় পৌঁছেছে। আদিবের (সন্দীপের) সাথে কিছুক্ষণ মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো চন্দনা। আজও মায়ের নামে কটুকথা বানিয়ে বলতে ভুল হলো না তার।
এভাবে চলছে দিন, দিন গিয়ে মাসে পরিণত হয়েছে। একটি মাস গত হয়ে গেলো! এরমধ্যে সন্দীপ একটিবারও কল দিলো না মাকে। জোৎস্না দেবী নানান টেনশনে অসুস্থ হয়ে গিয়েছেন। সারাক্ষণ মনটা আকুপাকু করছে ছেলেটার সাথে একটু কথা বলার জন্য। ঠিকভাবে খাওয়া-দাওয়া অবধি করতে পারছেন না। তবুও নামাজ পড়ে প্রতিনিয়ত ছেলের মঙ্গল কামনা করছেন। হ্যাঁ এরাই হচ্ছে "মা"!
মাঝরাতে আরুশির চিৎকার করা কান্নার আওয়াজ কানে পৌঁছাতেই ঘুম ভেঙে গেলো জোৎস্না দেবীর। তড়িঘড়ি করে উঠে চন্দনার রুমের কাছে গেলেন। হাঁক ছেড়ে ডাকলেন,
"বউমা, আরুশি এমন করে কাঁদছে কেনো?"
কিন্তু ভিতর থেকে কোনো উত্তর আসলো না। দরজা খোলাই আছে, অন্ধকারে হাতড়িয়ে তিনি রুমে প্রবেশ করলেন। রুমের লাইট জ্বালাতেই আতঙ্কে উঠলেন তিনি। কারণ, চন্দনা রুমে নেই! মুহূর্তেই মনটা কু-ডাক দিলো। পরদিন সকালে সারা পাড়ায় রটে গেলো চন্দনা ও বিদেশ পালাতে গিয়ে ধরা পড়েছে। বিদেশের বউ রাতে টের পেয়ে লোক দিয়ে ধরিয়েছে। এলাকার চেয়ারম্যান বাড়িতে দুজনকে আটকে রাখা হয়েছে।
বেলা দশটা, চেয়ারম্যান বাড়িতে অনেক লোকজন। চন্দনা কান্না-কাটি করে মাপ চাইছে। এখানে উপস্থিত রয়েছেন জোৎস্না দেবী ও আরুশি। চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, "এই বিষয় সন্দীপকে জানানো উচিত।"
চন্দনা শাশুড়ির পা জড়িয়ে ধরে কান্না করে বললো, "আম্মা আমাকে ক্ষমা করে দিন! সন্দীপকে জানাতে না করেন। আমার ভুল হয়ে গিয়েছে!" আরুশির মুখের দিকে চেয়ে জোৎস্না দেবী সবার হাতে পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে চন্দনাকে বাড়ি নিয়ে আসলেন।
দিন পনের চলে গেলো। বিদেশের সাথে পুনরায় বেশ সতর্ক ভাবে যোগাযোগ শুরু করলো চন্দনা। এদিকে বিদেশের জেদ চেপেছে চন্দনাকে তার চাই-ই চাই! বিদেশের কাছে চন্দনার কিছু গোপন ভিডিও ছিল। হঠাৎ একদিন সে সেগুলো সন্দীপকে পাঠিয়ে দিলো।
আজ শুক্রবার, সন্দীপের ছুটির দিন। হুট করে ইমুতে অচেনা নাম্বার থেকে কিছু ভিডিও ফুটেজ আসলো। যা দেখে সন্দীপের গোটা দুনিয়াটা অন্ধকারে ছেঁয়ে গেলো। নিজের চোখ দুটোকে বিশ্বাস করতে পারছে না এটা তার চন্দনা! "না! না হতে পারে না" বলে পাগলের মতো চিৎকার দিয়ে উঠলো সে।

Comments
Post a Comment