রতনের বিষাদভরা দিন গুলো

 শীতের সন্ধ্যা। কনকনে হাওয়া কাঁপিয়ে দিচ্ছিলো রতনের জীর্ণ শরীরটা। রাস্তার মোড়ে ছোট্ট চায়ের দোকানের ঝাঁপ ফেলা, আলো নিভে গেছে। রতন একটা ভাঙা টুলের উপর বসেছিল, হাতে ধরা চায়ের খালি কাপ। কাপটা তখনও গরম, কিন্তু তার ভেতরে চা ছিল না। ঠিক যেন তার জীবনের মতো—একটা উষ্ণতার রেশ ছিল ঠিকই, কিন্তু তৃপ্তি ছিল না।

click  





আজ তার স্ত্রীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। স্মৃতিগুলো ছবির মতো ভেসে আসছিল। মায়া। তার মায়া। শান্ত, স্নিগ্ধ একটা হাসি ছিল তার মুখে, যা রতনের সব দুঃখ ভুলিয়ে দিত। মায়া চলে যাওয়ার পর থেকেই রতনের জীবনে যেন এক অদ্ভুত শূন্যতা। প্রথমে তো কাজ করার শক্তিই পেত না। দিনের পর দিন দোকানের ঝাঁপ বন্ধ থাকতো। পাড়ার লোকেরা সাহায্য করেছিল, খাবার এনে দিত, সান্ত্বনা দিত। কিন্তু মনের ভেতরে যে ক্ষত, তা কেউ ভরাতে পারেনি।

সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে মায়ার গান। সে এক অদ্ভুত সুরে গান গাইতো। রতন যখন দোকানে বসে উদাস হয়ে যেত, মায়া তখন গুনগুন করে গান শুরু করতো। সে সুর শুনলে রতনের মনে হতো, যেন সমস্ত বেদনা গলে জল হয়ে যাচ্ছে। আজ সেই সুর আর নেই। এখন শুধু শূন্যতা।

click  






মাঝেমধ্যে রতন মায়ার পুরনো শাড়িগুলো বের করে দেখে। শাড়ির ভাঁজে লেগে থাকা মায়ার গন্ধটা তাকে আরও বেশি বিষণ্ণ করে তোলে। সেদিনের কথা মনে পড়ে, যখন মায়া শেষ নিঃশ্বাস ফেলছিল। রতনের হাতটা ধরেছিল শক্ত করে। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছিল রতনের। মায়া শুধু বলেছিল, "আমাকেই যেন মনে রাখো।"

রতনের চোখে জল চিকচিক করে উঠলো। হ্যাঁ, সে মনে রেখেছে। প্রতিটি মুহূর্তে সে মায়াকে মনে রেখেছে। কিন্তু এই মনে রাখাটা যেন এক মিষ্টি যন্ত্রণার মতো। বিষাদমাখা এক ভালোবাসা, যা তাকে প্রতিদিন তিলে তিলে পোড়াচ্ছে। সে জানে, এই দুঃখ তার সঙ্গী হয়ে থাকবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। চায়ের কাপটা আরও শক্ত করে ধরলো রতন। কাপের ভেতরের সামান্য উষ্ণতাটুকুও এখন আর অনুভূত হচ্ছে না। কেবল শীতের তীব্রতা আর এক বুক দীর্ঘশ্বাস।


Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বাসের মূল্য রক্তবিষাদির আতুর ঘরে । লেখক বাবুল বিশ্বাস। পর্ব ১

বিশ্বাসের মূল্য রক্তবিষাদির আতুর ঘরে। লেখক বাবুল বিশ্বাস। পর্ব ২

মেঘের ওপারে আলো লেখক- Tahmina Akhter